ছন্দ কাব্যতত্ত্বের একটি পরিভাষা। রবীন্দ্রনাথের মতে, 'কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দেবার জন্যই ছন্দ।' ছন্দ কাব্যে এনে দেয় সংগীতের সুর লহরি। মাত্রা-নিয়মের যে বিচিত্রতায় কাব্যের ইচ্ছাটি বিশেষভাবে ধ্বনি-রূপময় হয়ে উঠে তাকেই ছন্দ বলে।
পঙ্ক্তি:
কবিতার প্রত্যেকটি লাইনকেই ভিন্ন ভিন্ন পঙ্ক্তি হিসেবে ধরা হয়, এতে অর্থের পরিসমাপ্তি ঘটুক আর নাই ঘটুক। যেমন-
'বুলেট ছুঁড়ে বুদ্ধিজীবী ছাত্র মারা
কৃষক বণিক দোকানী আর মজুর মারা
ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ মারা খুবই সহজ।'
- মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
(এখানে ৪টি পঙ্ক্তি)
অক্ষর:
বাগযন্ত্রের ক্ষুদ্রতম প্রয়াসে উচ্চারিত ধ্বনি বা শব্দাংশের নাম অক্ষর। যেমন- 'মা' এক অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ; 'মামা' দুই অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ, কিন্তু 'মাঠ' এক অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ, কারণ মাঠ ব্যঞ্জনাত্মক শব্দ এবং তা ভেঙে উচ্চারণ করা যায় না।
মুক্তাক্ষর: স্বরধ্বনি দিয়ে শেষ হওয়া বা স্বরধ্বনি যুক্ত অক্ষরকে মুক্তাক্ষর বলে। যেমন- মামা, বাবা, মারা ইত্যাদি।
বদ্ধাক্ষর: ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে শেষ হওয়া অক্ষরকে বদ্ধাক্ষর বলে। যেমন- বন, মাঠ, গাছ ইত্যাদি।
ছন্দ:
সংস্কৃত ভাষায় 'ছন্দ' শব্দের অর্থ কাব্যের মাত্রা। কোনো কিছুর মধ্যে পরিমিত ও শৃঙ্খলার সুষম ও যৌক্তিক বিন্যাসকে ছন্দ বলে।
বাংলা ছন্দের প্রকারভেদ:
বাংলা ছন্দ তিন প্রকার। যথা: ১. স্বরবৃত্ত, ২. মাত্রাবৃত্ত, ৩. অক্ষরবৃত্ত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
স্বরবৃত্ত ছন্দ:
যে ছন্দ রীতিতে উচ্চারণের গতিবেগ বা লয় দ্রুত অক্ষরমাত্রেই এক মাত্রার হয়, তাঁকে স্বরবৃত্ত ছন্দ বলে। এ ছন্দের মূল পর্বের মাত্রা সংখ্যা চার। এ ছন্দকে দলবৃত্ত বা লৌকিক ছন্দ বা শ্বাসাঘাত ছন্দ বা ছড়ার ছন্দ বলে।
উদাহরণ-
বৃষ্টি পড়ে / টাপুর টুপুর / নদেয় এল / বান
(মাত্রা - ৪/৪/৪/১)
শিব ঠাকুরের / বিয়ে হলো / তিন কন্যে / দান
(মাত্রা - ৪/৪/৪/১)।
স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য:
ক. মূল পর্বে মাত্রা সংখ্যা ৪।
খ. এ ছন্দের লয় দ্রুত।
গ. যে কোনো অক্ষর (মুক্তাক্ষর বা বদ্ধাক্ষর) একমাত্রার।
উদাহরণ: আড়াল = আ (১) + ড়াল (১) = ২ স্বর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
যে ছন্দে সকল প্রকার মুক্তাক্ষর একমাত্রাবিশিষ্ট এবং বদ্ধাক্ষর শব্দের শেষে দুই মাত্রা, কিন্তু শব্দের আদিতে এবং মধ্যে একমাত্রা ধরা হয়, তাঁকে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বলে। একে যৌগিক বা কলামাত্রিক ছন্দ বলে।
উদাহরণ:
মরিতে চাহিনা আমি / সুন্দর ভুবনে (৮+৬)
মানবের মাঝে আমি / বাঁচিবারে চাই (৮+৬)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য
ক. মূল পর্বে মাত্রা সংখ্যা ৮ বা ১০ মাত্রার হয়।
খ. এ ছন্দে লয় ধীর বা মধ্যম।
গ. এ ছন্দে শব্দের আদি ও মধ্যে বদ্ধাক্ষর একমাত্রা এবং শব্দের শেষে দুই মাত্রা হয়।
ঘ. এ ছন্দে সংযুক্ত বা অসংযুক্ত অক্ষর সমান ধরা হয়।
উদাহরণ: কেষ্টা = কে (১) + ষ্টা (১) = ২ অক্ষর।
বিভিন্ন ছন্দে মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর এর মাত্রা:
ছন্দ | মুক্তাক্ষর | বদ্ধাক্ষর |
| স্বরবৃত্ত | একমাত্রা | একমাত্রা |
| মাত্রাবৃত্ত | দুইমাত্রা | |
| অক্ষরবৃত্ত | দুইমাত্রা। তবে শব্দের প্রথমে ও মধ্যে থাকলে একমাত্রা। |
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
যে কাব্য ছন্দে মূল পর্ব চার, পাঁচ, ছয় বা সাত মাত্রার হয় এবং যা মধ্যম লয়ে পাঠ করা হয়, তাঁকে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বলে। এ ছন্দকে বর্ণবৃত্ত বা ধ্বনিপ্রধান ছন্দ বা কলাবৃত্ত ছন্দ বলে। উদাহরণ-
সোনার পাখি ছিল
সোনার খাঁচাটিতে
বনের পাখি ছিল
বনে
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(মাত্রা - ৭/৭/৭/২)।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য:
ক. মূল পর্বে মাত্রা সংখ্যা ৪, ৫, ৬,৭ বা ৮ মাত্রার হয়।
খ. এ ছন্দে প্রধানত ৬ মাত্রার প্রচলন বেশি।
গ. অনুস্বর বা বিসর্গের পূর্ববর্তী স্বর দীর্ঘ।
উদাহরণ: আমরা = আম (১+১) + রা (১) = ৩ অক্ষর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
অমিত্রাক্ষর ছন্দ (Blank Verse)
কবিতার পঙ্ক্তির শেষে মিলহীন ছন্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বলে। অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতায় চরণের অন্ত্যমিল থাকে না। এ ছন্দ পয়ারের অপর রূপ। প্রতি পঙ্ক্তিতে ১৪ অক্ষর থাকে, যা ৮+৬ পর্বে বিভক্ত। একে প্রবাহমান অক্ষরবৃত্ত ছন্দও বলে। উদাহরণ-
সম্মুখ-সমরে পড়ি, বীর চূড়ামণি
বীর বাহু চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি,
কোন বীরবরে রবি সেনাপতি পদে,
পাঠাইলা, রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি।
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত
বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ও সনেটের প্রচলন ঘটান মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সনেটে মধুসূদনের প্রবল দেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে।
সনেট ইটালিয়ান শব্দ। এর বাংলা অর্থ- চতুর্দশপদী কবিতা। একটি মাত্র ভাব বা অনুভূতি যখন ১৪ অক্ষরের চতুর্দশ পঙ্ক্তিতে (কখনো কখনো ১৮ অক্ষরও ব্যবহৃত হয়) বিশেষ ছন্দরীতিতে প্রকাশ পায়, তাকেই সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা বলে।
সনেটের দুটি অংশ। যথা:
ক. অষ্টক: প্রথম ৮ চরণকে অষ্টক বলে।
খ. ষটক: শেষ ৬ চরণকে ষটক বলে।
সনেটের আদি কবি:
ইতালীয় কবি পেত্রার্ক এ ধারার আদি কবি।
বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ও সনেটের প্রচলন ঘটান মাইকেল মধুসূদন দত্ত।